ভার্সাই চুক্তি কি?

ভার্সাই চুক্তি

১৯১৯ সালের ২৮ জুন মিত্র ও সহযোগী শক্তিবর্গ এবং জার্মানির মধ্যে ভার্সাই চুক্তি (Treaty of Versailles) সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতির যথার্থ প্রতিফলন ঘটে নি। এক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতি ও ভার্সাই চুক্তির বিভিন্ন শর্তসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলে এর যথার্থতা প্রতীয়মান হয়ে উঠে।

ভার্সাই চুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার

ভার্সাই চুক্তি ছিল জার্মানির উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি চুক্তি। উড্রো উইলসনের চৌদ্দ দফায় আস্থা রেখেই জার্মানি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। উইলসনের নীতির প্রধান দিক ছিল স্বাধিকার বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। কিন্তু এই নীতির প্রয়োগে কোনো সামঞ্জস্য রক্ষা করা হয় নি।

জার্মানির প্রতি কঠোর চুক্তি চাপিয়ে দিতে এবং একই সাথে মিত্রশক্তিবর্গের নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক ক্ষেত্রে চৌদ্দ দফায় বর্ণিত মূলনীতিসমূহের বরখেলাপ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, পোল্যান্ডকে যে সকল স্থান দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর কয়েকটিতে জার্মান জাতির লোকসংখ্যা বেশি ছিল অথবা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত পোল্যান্ডে জার্মান জাতির লোকের এ একই অধিকার উপেক্ষিত হয়েছিল।

ইতালির রাজ্যসীমাও জাতীয়তার নীতিতে করা হয় নি। যে আশা নিয়ে ইতালি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তা ব্যাহত হওয়ার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে যুদ্ধোত্তর ইতালিতে এক গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। আবার জার্মানির কাছ থেকে যে বৈদেশিক অধিকারসমূহ কেড়ে নেওয়া হয় সেখানে উদার, খোলা মন ও সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়ে সকল ঔপনিবেশিক দাবি মেটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।

অন্যদিকে জার্মানির সাথে জার্মান জাতির লোক-অধ্যুষিত অস্ট্রিয়ার স্বেচ্ছাধীনভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ রুদ্ধ করে ভার্সাই-এর শান্তি চুক্তি ভৌগোলিক মীমাংসার ক্ষেত্রে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে খর্ব ও পদদলিত করেছিল।

অস্ট্রিয়া ও জার্মানির ঐক্যের ফলে আন্তর্জাতিক শান্তি বিনষ্ট হওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, জার্মানির প্রতি ব্যবহারে ন্যায় ও উদারতা প্রদর্শন ত্রুটি সেই আশঙ্কা কোন অংশে হ্রাস করেছিল বলা বলে না। পরাজিত শত্রুকে উদারনীতির মাধ্যমে মিত্রতে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা বা দূরদর্শিতা মিত্রশক্তিবর্গ উপলব্ধি করে নি।

সুতরাং অস্ট্রিয়ার ও জার্মানির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাব্য ফল হিসেবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হতে পারে এই যুক্তিতে জার্মানিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার হতে বঞ্চিত করে প্রকৃতপক্ষে পরাজিত ও অপমানিত জার্মান জাতির মনে প্রথম হতেই ভার্সাই-এর শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করার প্রতিজ্ঞা ও ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা হয়েছিল।

বস্তুত ভার্সাই চুক্তিতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতি যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়ায় ভার্সাই চুক্তিকে একটি কলঙ্কিত দলিল বলে অভিহিত করা যায়। আর এজন্যই ভার্সাই চুক্তির উপর মন্তব্য করতে গিয়ে অধ্যাপক ই.এইচ. কার বলেন যে, ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মান জাতির উপর যে সকল দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয় কালক্রমে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সেগুলো হয় চুক্তি অথবা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে অথবা জার্মানি কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের দরুন একে একে রদ হয়ে যায়।

জার্মানিকে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার না দেওয়ায় তার প্রতি যে অবিচার করা হয় সে অবিচারের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই হিটলারের নেতৃত্বে তারা তৎপর হয়ে উঠে এবং বিশ বছর পর জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে। আসলে ভার্সাই চুক্তিতেই ভাবী যুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল।

মার্শাল ফসের ভাষায় “This is not peace, it is an armistice for twenty years” অর্থাৎ এটা (ভার্সাই চুক্তি) শান্তি নয়, এটা বিশ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.