ষাট গম্বুজ মসজিদ
ইতিহাস

বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদ পরিচিতি

মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। খাঞ্জালী তথা খান জাহান আলী নামক একজন স্থানীয় শাসক ও সাধক পুরুষ এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। এ মসজিদে সর্বমোট ৮১টি গম্বুজ থাকলেও ইহা নির্মাণকাল থেকেই ৬০ গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। সম্ভবত মসজিদের ভিতরে ৬০টি স্তম্ভ থাকায় এরুপ নামকরণ হয়েছে।

নির্মাতার পরিচয়ঃ

খান জাহান আলী সংক্ষেপে খাঞ্জালী ছিলেন পারস্যের অধিবাসী প্রথম জীবনের কোন এক পর্যায়ে তিনি ভারতবর্ষের সুলতানের দরবারে আসেন। সেখান থেকে তিনি বাংলাদেশে এসে বর্তমান এসে বসতি স্থাপন করেন। তখন বাংলাদেশের শাসনকর্তা ছিলেন রাজা গনেশের পুত্র জালাল উদ্দিন মুহম্মদ শাহ অর্থাৎ যদু (১৪১৮-১৪৩২ খ্রিঃ)। বাংলাদেশে এসে তিনি প্রথমে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন। ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করতেন। ফলে গৌড়ের মুসলিম সুলতানগণ তাকে প্রায় স্বাধীনভাবে সুন্দরবন এলাকা শাসন করতে দিয়েছিলেন। ৪০ বছর রাজত্ব করার পর ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৪০ বছরের শাসনকালে তিনি মসজিদ, দীঘি, রাস্তাঘাট প্রভৃতি তৈরী করেছিলেন।

স্থাপত্যের সংজ্ঞাঃ

ষাট গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য জানার আগে স্থাপত্যের প্রকৃত সংজ্ঞা জানা আবশ্যক। স্থাপত্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিকগণ একমত হতে পারেননি। কোন কোন ঐতিহাসিক যে কোন নির্মিত বস্তুকে স্থাপত্য বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেহ কেহ সুদৃঢ় ও সুশোভিত হর্ম এবং প্রাসাদকে স্থাপত্যরূপে চিহ্নিত করেছেন। আভিধানিক ও শাব্দিক দিক দিয়ে স্থাপত্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ Architecture এর অর্থ হচ্ছে বাসস্থান নির্মাণ কৌশল বা প্রণালী। কাজেই সাধারণ স্থাপত্য বলতে আমরা মনুষ্য নির্মিত যে কোন প্রকারের স্বল্প পরিসরের কুঁড়েঘর বা প্রশস্ত অট্টালিকা বুঝি। তবে সব সময় ইহা প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে Prof W.R. Lethaby-এর সংজ্ঞা বিশেষ প্রণিধাণযোগ্য। তিনি বলেন “Architecture is the practical art of building touched with emotion not only the past, but now and in the future.” অর্থাৎ “ভাবাবেগ দ্বারা বা মহৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে যে কোন বিশেষ প্রক্রিয়া বা কৌশল অবলম্বনে তৈরী ঘর বা অট্টালিকাই স্থাপত্য।

১. আয়তন বা ভূমি পরিকল্পনাঃ

ষাট গম্বুজ মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাহিরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট এবং ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া।

২. দেওয়াল বা প্রাচীরঃ

মসজিদের দেওয়াল গুলো বেশ পুরু। প্রতিটি দেওয়াল প্রায় সাড়ে আট ফুট পুরু।

৩. প্রবেশ পথঃ

মসজিদের সামনের অর্থাৎ পূর্ব দেওয়ালে ১১টি প্রবেশ পথ আছে। দরজাগুলো আকারে বেশ বড়। মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে ৭টি দরজা। অর্থাৎ সর্বমোট ১৮টি দরজা রয়েছে।

৪. মিনারঃ

মসজিদের ৪ কোণে ৪টি বিরাট মিনার রয়েছে। এগুলো গোলাকার এবং কার্ণিসের কাছে এগুলোতে বলয়াকারের ব্যাস বয়েছে। মিনার গুলো কার্ণিসের অনেক উপরে উঠে গেছে এবং এগুলোর চূড়ায় রয়েছে অতি সুন্দর গম্বুজ। সামনের দুটি মিনার থেকে আজান দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। একটির নাম ছিল রওশন কোঠা এবং অন্যটির নাম ছিল আন্ধার কোঠা।

৫. স্তম্ভ বা পিলারঃ

মসজিদের ভিতরে ৬০টি স্তম্ভ রয়েছে। এগুলো জ্যামিতিক মাপে উত্তর-দক্ষিণে ৬ সারিতে বসানো হয়েছে এবং প্রত্যেক সারিতে ১০টি করে স্তম্ভ আছে। স্তম্ভগুলোকে পাথর কেটে মাপ মত তৈরী করা হয়েছে। সবগুলো স্তম্ভই পাথরের তৈরী। মাত্র ৫টি স্তম্ভের পাথর বাইরের দিকে ইট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

৬. গম্বুজঃ

৬০টি স্তম্ভ ও চার পাশের দেওয়ালের উপর মসজিদের গম্বুজগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ছাদের উপরে গম্বুজের মোট সংখ্যা ৭৭টি। গূর্ব দেওয়ালের মাঝের দরজা ও পশ্চিম দেওয়ালের মাঝের মিহরাবের মধ্যবর্তী স্থানে ছাদের উপর ৭টি গম্বুজ। এগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মত। বাকী ৭০টি গম্বুজ। অর্ধগোলাকার। তবে এ ৭০টি গম্বুজ দেখতে খুব বড় নয়। এছাড়া মসজিদের চারকোণায় চারটি মিনারের উপর আরও চারটি গম্বুজ আছে। তাতে গম্বুজের মোট সংখ্যা হয় ৮১টি। তবুও এর নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ। সম্ভবত মসজিদের ভিতরে ৬০টি স্তম্ভ থাকায় এরূপ নামকরণ হয়েছে।

৭. মিহরাবঃ

মসজিদের ভিতরে পশ্চিম দেওয়ালে মোট ১০টি মিহরাব রয়েছে। মাঝের মিহরাবটি অন্যান্য মিহরাবের চেয়ে আকারে অনেক বড়। এতে পাথরের অতি সুন্দর কাজ করা হয়েছে। যা আজও জ্বল জ্বল করছে। এ মিহরাবের দক্ষিণে পূর্ব দেওয়ালের দরজাগুলো বরাবর ৫টি মিহরাব আছে। মাঝের মেহরাবের উত্তর দিকে আছে মোট ৪টি মিহরাব। মাঝের মিহরাবের উত্তর পাশে যেখানে একটি মেহরাব থাকার কথা সেখানে আছে একটি ছোট দরজা। এ দরজা দিয়ে খান জাহান আলী সাহেব তার দরবারে প্রবেশ করতেন।

৮. মসজিদটির অন্যান্য উপযোগীতাঃ

কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে খান জাহান আলী সাহেব মসজিদকে তার দরবার হিসাবেও ব্যবহার করতেন। মাঝের মিহরাবের উত্তর দিকে যে একটি ছোট দরজা আছে সেটি দিয়ে তিনি দরবারে প্রবেশ করতেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন এ মসজিদটি মাদ্রাসা হিসাবেও ব্যবহৃত হত। মসজিদ ছাড়াও দরবার ও মাদ্রাসা হিসেবে এ মসজিদের ব্যবহারের বিষয়টি মোটেই অসম্ভব নয়। যেহেতু তিনি সাধক পুরুষ ছিলেন তাই তার যাবতীয় কর্মকান্ড এ মসজিদকে ঘিরে পরিচালিত হত।

বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ খান জাহান আলী সাহেবের এক অমর কীর্তি। যা মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি করেছে গৌরবান্বিত। এ মসজিদ আজও প্রতিষ্ঠাতার মহিমা ছড়াচ্ছে। মসজিদটির গায়ে কোন শিলালিপি না থাকায় এর সম্পর্কে অনেক তথ্য আমাদের অজানা রয়ে গেছে। যতটুকু পাঠোদ্বার করা সম্ভব হয়েছে তা এর বাহ্যিক অবয়ব থেকেই নেয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *